প্রিয় পাঠক! আজকে আমরা জানবো যে কী কী কারণে রোযা নষ্ট হয় এবং কাজা ও কাফ্ফারা ওয়াজিব হয়, আর কী কী কারণে রোযা নষ্ট হয় না, কিন্তু রোযা মাকরুহ হয়, অনুরূপভাবে কী কী কারণে রোযা নষ্ট হয় না এবং মাকরূহও হয় না। যেসব কারণে রোযা নষ্ট ও মাকরূহ হয় কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয় 2025
যেসব কারণে রোযা নষ্ট হয় কিন্তু কাফ্ফারা ওয়াজিব হয় না
যেসব কারণে রোযা নষ্ট ও মাকরূহ হয় কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয় 2025
এ বিষয়ে প্রথমে আমাদের জানা দরকার যে, রোযা নষ্ট হওয়ার কারণগুলি মূলত দু’প্রকারঃ
- প্রথম প্রকার হল, ওই সমস্ত কারণ, যার ফলে শুধু ওই রোযাটির কাযা ওয়াজিব হয়, তবে কাফফারা ওয়াজিব হয় না।
- আর দ্বিতীয় প্রকার হল ওই সমস্ত কারণ, যার ফলে কাযা এবং কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হয়।
ওই সমস্ত কারণ, যার ফলে রোযা নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু শুধু ওই রোযাটির কাযা ওয়াজিব হয়, কোন কাফফারা ওয়াজিব হয় না,
যেমনঃ
(১) যদি কেউ ইচ্ছাকৃত রোযা না রাখে, তাহলে। সেক্ষেত্রে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
(২) যদি কেউ রোযা রাখার পর দিনের বেলা খুব অসুস্থতার কারণে রোযা ভেঙ্গে ফেলে তাহলে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।
(৩) অনুরূপভাবে, নাকে ও কানে ওষুধ দিলে, শুধু কাজা করতে হবে।
(৪) উযু-গোসলে কুলি করার সময় অসাবধানতার কারণে গলদেশে পানি চলে গেলে।
(৫) হস্তমৈথুন অথবা যে কোন কারণে উত্তেজনার সাথে বীর্যপাত হলে,
(৬) বিড়ি, সিগারেট, খৈনি বা হুক্কা ইত্যাদি পান করলে,
(৭) ইচ্ছাকৃত মুখভরে বমি করলে অথবা অল্প বমি করে সেটা গিলে ফেললে,
(৮) মুখে পান, তামাক, খৈনি ইত্যাদি রেখে ঘুমিয়ে পড়ে সেই অবস্থায় সাহ্রীর টাইম পার হয়ে গেলে,
(৯) সাহ্রীর সময় শেষ হওয়ার পর, এখনও সময় বাকি আছে মনে করে পানাহার করলে,
(১০) ইফতারের সময় হওয়ার পূর্বে, সময় হয়ে গেছে মনে করে ইফতার করে ফেললে। এ সমস্ত কারণে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। তবে শুধুমাত্র কাযা ওয়াজিব হবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
যেসব কারণে রোযা নষ্ট ও মাকরূহ হয় কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয় 2025
যেসব কারণে রোযার কাযা ও কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হয়
যেসব কারণে রোযার কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয়।
যেমনঃ
(১) দিনের বেলা রোযা স্মরণ থাকা অবস্থায় ইচ্ছাকৃত কোন খাদ্য ও পানীয় বস্তু পানাহার করলে কাযা এবং কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে।
সহীহ বুখারীর ৬৬৬৯ নম্বর হাদীসে একথা উল্লেখ আছে।
(২) রোযা স্মরণ থাকা অবস্থায় দিনের বেলা স্ত্রী সহবাস করলে কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয। বীর্যপা হোক কিংবা না হোক, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উপর কাযা এবং কাফফারা দুটিই ওয়াজিব হবে।
যেসব কারণে রোযা নষ্ট ও মাকরূহ হয় কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয় 2025
রোযার কাফফারা কিভাবে আদায় করতে হয়?
এখানে বলে রাখি, রোযার কাফফারা কীভাবে আদায় করতে হবে? এ সম্পর্কে আমরা একটি ঘটনা লক্ষ্য করি।
সহীহ বুখারীর ১৯৩৬ নম্বর হাদীসে আবু হুরাইরাহ (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেছেনঃ একসময় আমরা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে বসেছিলাম।
এমতাবস্থায় একব্যক্তি এসে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি বরবাদ হয়ে গেছি।
নবীজী বললেনঃ কেন? তোমার কী হয়েছে?
উত্তরে লোকটি বললঃ আমি রোযা অবস্থায় দিনের বেলা স্ত্রীর সহবাস করে ফেলেছি। এখন আমার উপায় কী হবে?
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তোমার জন্য ৩টি উপায় আছেঃ
(১) তুমি কি একটি গোলাম আযাদ করতে পাররে লোকটি বললঃ না। আমি গরীব মানুষ, গোলাম কোথায় পাব?
(২) নবীজী বললেনঃ তুমি কি ধারাবাহিক ভাবে ৬০টি রোজা রাখতে পারবে?
উত্তরে লোকটি বললঃ না। (একমাস রোযা রাখা তাই আমার জন্য কষ্টকর হল, তাতে আবার দীর্ঘ দু’মাস ধারাবাহিক ভাবে রোযা কীভাবে রাখব? এটা আমার দ্বারা অসম্ভব।)
(৩) অবশেষে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তোমার জন্য সর্বশেষ উপায় হল, ৬০টি মিসকীনকে দু’বেলা খাওয়ানো। এটা পারবে কি?
উত্তরে লোকটি বললা না।
আবূ হুরাইরাহ (রযি) বললেনঃ কিছুক্ষণ পর নবী সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক ঝুড়ি খেজুরের দান আসল।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই লোকটিকে ঝুড়িটি দিয়ে বললেনঃ নাও, এটা নিয়ে গরীবদের মাঝে কাফফারা বাবদ বণ্টন করে দাও।
লোকটি বললঃ হে আল্লাহর রসূল! কাকে দান করব যে ব্যক্তি আমার চেয়ে বেশি গরীব তাকে দিব? অথচ মদীনার এ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে আমার চেয়ে গরীব কেউ নেই।
লোকটির কথা শুনে বিশ্বনবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন ভাবে হেসে ফেললেন যে, তাঁর সামনের দাঁতগুলি দেখা গেল।
অবশেষে দয়ার নবী বললেনঃ যাও, তুমি তোমার বিবি-বাচ্চাদেরকে আগে খাওয়াও। (তারপর সামর্থ হলে পরে কাফফার আদায় করে দিও।)
এ হাদীস দ্বারা বোঝা গেল, রোযা রাখার পর ইচ্ছাকৃত ভাবে রোযা নষ্ট করলে এভাবে কাফফারা আদায় করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে উত্তমরূপে রোযা আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
যেসব কারণে রোযা নষ্ট ও মাকরূহ হয় কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয় 2025
যেসব কারণে রোযা নষ্ট হয় না এবং রোযা মাকরূহও হয় না
যেমনঃ
(১) রোযা অবস্থায় যে কোন ধরণের মিসওয়াক করলে রোযা নষ্ট হয় না এবং রোযা মাকরূহও হয় না। তবে টুথপেস্ট ব্যবহার করলে রোযা মাকরূহ হবে।
(২) চোখে সুরমা লাগালে বা কোন ওষুধ দিলে, রোজা নষ্ট হয় না আর মাকরূহও হয়না।
(৩) খুশবু লাগালে বা তার ঘ্রাণ শুঁকলে,
(৪) ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে,
(৫) নিজের মুখের থুতু গিলে ফেললে রোযা মাকরূহ হবে না। তবে, অধিক পরিমাণে থুতু একত্রিত করে গিলে ফেললে মাকরূহ হবে।
(৬) রোযা স্মরণ না থাকার কারণে ভুল করে পানাহার কিংবা স্ত্রী সহবাস করলে রোযা নষ্ট হয় না।
(৭) অনিচ্ছাকৃত ভাবে গলার মধ্যে ধোঁয়া, ধুলোবালি কিংবা মশা-মাছি গেলে রোযা নষ্ট হয় না।
(৮) অনিচ্ছাকৃত ভাবে বমি হলে রোযা নষ্ট হয় না। যদিও বেশি হোক তবুও রোযা নষ্ট হবে না এবং রোযা মাকরূহও হবে না।
(৯) যে কোন ধরণের ইঞ্জেকশন, টিকা, রক্ত, স্যালাইন ও ভ্যাকসিন নিলে রোযা নষ্ট হবে না এবং রোযা মাকরূহও হবে না।
তবে ক্ষুধা নিবারণ ও শক্তির উদ্দেশ্যে স্যালাইন দিলে রোযা মাকরূহ হবে।
(১০) রোযা অবস্থায় ইঞ্জেকশনের সাহায্যে শরীর থেকে রক্ত বের করলে এবং এতে দুর্বলতার আশঙ্কা না থাকলে রোযা মাকরূহ হবে না।
যেসব কারণে রোযা নষ্ট ও মাকরূহ হয় কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয় 2025
যে সমস্ত কারণে রোযা নষ্ট হয় না। তবে রোযা মাকরূহ হয়ে যায়
যেমনঃ
(১) বিনা প্রয়োজনে কোন বস্তু মুখে চিবিয়ে ফেলে দিলে রোযা মাকরূহ হয়ে যায়।
(২) তরকারী ইত্যাদির লবণ চেখে ফেলে দিলে, যদি গলদেশে না যায়, তাহলে রোষ নষ্ট হবে না।
তবে বিনা প্রয়োজনে এমনটা করলে রোযা মাকরূত হয়ে যাবে।
যে মহিলার স্বামী বদমেজাজ তার জন্য শুধুমাত্র জিভের আগায় স্বাদ চেখে দেখা জাইয আছে। এতে রোজা মাকরূহ হবে না।
(৩) কোন প্রকারের মাজন, কয়লা, গুল ও টুথপেস্ট ইত্যাদি ব্যবহার করা মাকরূহ।
তবে খেয়াল রাখতে হবে, সামান্য পরিমাণ কিছু গলার মধ্যে প্রবেশ করলেই রোষা নষ্ট হয়ে যাবে।
(৪) নাপাক অবস্থায় বিনা গোসলে সারা দিন অতিবাহিত করা মাকরূহ।
(৫) রোযা অবস্থায় স্ত্রীকে চুমা দিয়ে অথবা তাকে আলিঙ্গন করলে রোযা মাকরূহ হবে।
তবে বয়স্কদের ক্ষেত্রে যদি উত্তেজনার আশংকা না থাকে, তাহলে রোযা মাকরূহ হবে না।
(৬) রোযা অবস্থায় গীবত, চোগলখোরী মিথ্যা এবং গালিগালাজ ও ঝগড়া-ফাসাদ করলে রোযা মাকরূহ হয়ে যাবে।
এ সম্পর্কে আমরা একটি হাদীস লক্ষ্য করি।
সুনানে ইবনে মাজার ১৬৯০ নম্বর হাদীসে আবু হুরাইরাহ (রযি) থেকে বর্ণিত আছে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
رُبَّ صَائِم لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الجُوعُ
অর্থ: অনেক রোযাদার এমন আছে, যাদের রোযার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই মেলে না।
এর অর্থ হল, বহু রোযাদার এমন আছে, যারা রোযা অবস্থায় থাকে বটে, কিন্তু রোযা অবস্থায় গোনাহ থেকে পরহেয করে না তাই তাদের রোযার বিনিময়ে কোন সাওয়াব মেলে না। শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় থাকাটাই তাদের সার।
দুআ করি, আল্লাহ তায়ালা আমদেরকে রোযা অবস্থায় যাবতীয় গোনাহ থেকে পরহেয করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
যেসব কারণে রোযা নষ্ট ও মাকরূহ হয় কাযা ও কাফ্ফারা দু’টিই ওয়াজিব হয় 2025
👇আরো দেখুন 👇
অডিও কুরআন তিলাওয়াত অনুবাদ সহ-Audio Quran with Translation

আসসালামু আলাইকুম।
প্রিয় পাঠক!
আমার নাম মোঃ নাজামুল হক, আমি একটি ইসলামী মাদ্রাসার শিক্ষক।
আমি মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি অনলাইনে ইসলামিক প্রবন্ধ লিখতে থাকি, যাতে মানুষ সঠিক বিষয় জানতে পারে।
আপনি আমাদের সাথে সংযুক্ত থাকুন এবং সঠিক তথ্য থেকে উপকৃত হন।
আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে বা আমাদের কোন ভুল সম্পর্কে জানাতে চান, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, জাযাকুমুল্লাহু খাইরন।